ছবি ভিডিও ভিডিও
অপরাধ, আমার দেশ, ঢাকা, বিশেষ প্রতিবেদন, শীর্ষ

ফকিরাপুলে সন্ত্রাসী তাণ্ডব : ​মাদকের সুবিধা না দেওয়ায় হোটেলে হামলা, মালিকসহ রক্তাক্ত ৪

প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬ | ৩:৪৫ অপরাহ্ণ




৩০ জনের নারকীয় তাণ্ডবে রিসেপশন লন্ডভন্ড, ক্যাশ কাউন্টার ভেঙে লুট ২ লাখ টাকা, সিসিটিভিতে ধরা পড়েছে অপরাধীদের মুখ, চরম আতঙ্কে মতিঝিলের ব্যবসায়ীরা।

​নিজস্ব প্রতিবেদক: ​রাজধানীর ব্যস্ততম বাণিজ্যিক এলাকা মতিঝিলের ফকিরাপুলে অনৈতিক আবদার ও মাদক সেবনের সুযোগ না দেওয়ায় একটি আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ সন্ত্রাসী তাণ্ডব চালানো হয়েছে।

২৫ থেকে ৩০ জনের একদল সংঘবদ্ধ দুর্বৃত্ত লাঠিসোঁটা, রড ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে চড়াও হয়ে পিটিয়ে রক্তাক্ত করেছে হোটেলের মালিক ও তিন ম্যানেজারকে। রিসেপশনে তাণ্ডব চালিয়ে ভেঙে ফেলা হয়েছে ক্যাশ কাউন্টার, লুট করা হয়েছে নগদ দুই লাখ টাকাসহ কর্মচারীদের পকেটে থাকা বেতন ও মোবাইল ফোন।

​গত সোমবার (১২ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৬টা ৪ মিনিটে ফকিরাপুলের ‘হোটেল আল আজিজ আবাসিক’-এ এই ঘটনা ঘটে। সম্পূর্ণ অপরাধের রুদ্ধশ্বাস চিত্র ধরা পড়েছে হোটেলের সিসিটিভি ক্যামেরায়। এ ঘটনায় মতিঝিল থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। জনবহুল এলাকায় এমন প্রকাশ্যে তাণ্ডবের ঘটনায় চরম আতঙ্ক ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে স্থানীয় ব্যবসায়ী মহলে।

​শুরুটা অনৈতিক আবদারেঃ ​হোটেল কর্তৃপক্ষ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, হামলার কিছুক্ষণ আগে চারজন যুবক হোটেলে প্রবেশ করে। তারা কোনো নিয়মকানুন না মেনে একটি রুম দাবি করে এবং সেখানে বসে মাদক সেবনের বেআইনি সুবিধা চায়। ​হোটেল কর্তৃপক্ষ শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার স্বার্থে তাদের এই অনৈতিক প্রস্তাব সঙ্গে সঙ্গেই প্রত্যাখান করে। এতে যুবকরা ক্ষিপ্ত হয়ে কর্মীদের সঙ্গে চড়াও হয় এবং দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়ে বেরিয়ে যায়। কিন্তু এটি ছিল বড় হামলার আগে ভয় দেখানোর কৌশল মাত্র। এর ঠিক কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা আরও ২৫ থেকে ৩০ জন বহিরাগত সশস্ত্র ক্যাডার ডেকে এনে দ্বিগুণ আক্রোশে হোটেলটিতে হামলা চালায়। ​পিটিয়ে রক্তগঙ্গা, ক্যাশ থেকে লুট ২ লাখ ​সন্ধ্যার ব্যস্ত সময়ে আচমকাই রড ও লাঠিসোঁটা হাতে সন্ত্রাসীরা হোটেলের রিসেপশনে ঢুকে তাণ্ডব শুরু করে। বাধা দিতে গেলে একের পর এক আঘাত নামিয়ে আনা হয় হোটেলের মালিক ও ম্যানেজারদের ওপর। এলোপাথাড়ি পিটিয়ে তাঁদের রক্তভেজা জখম করা হয়। ​ভাঙচুরের একপর্যায়ে রিসেপশনের থাই গ্লাস ও আসবাবপত্র চুরমার করে দেওয়া হয়। এরপর দুর্বৃত্তরা ড্রয়ার ভেঙে ক্যাশে থাকা নগদ ২ লাখ টাকা লুট করে নেয়। এ সময় ম্যানেজার আব্দুল্লাহ আল মামুনের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে তাঁর পকেটে থাকা বেতনের জমানো ১২ হাজার ৫০০ টাকা ও ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি কেড়ে নেওয়া হয়। পকেট থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয় অন্যান্য কর্মচারীদের মানিব্যাগও।

​হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রক্তাক্ত ৪ জন
​সংঘবদ্ধ এই বর্বরোচিত হামলায় মারাত্মকভাবে আহত চারজনকে উদ্ধার করে নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়। আহতরা হলেন, ​সোহাগ মিয়া (৩৯): হোটেলের মালিক ​আব্দুল্লাহ আল মামুন (২৬): ম্যানেজার সামিউল ইসলাম শান্ত (২৬): ম্যানেজার
​আনোয়ার হোসেন (৪৬): ম্যানেজার
​হোটেল কর্তৃপক্ষের দাবি, আহতদের আঘাত গুরুতর। তাঁদের চিকিৎসাসংক্রান্ত সব কাগজপত্র ও সিটি স্ক্যান রিপোর্ট থানায় প্রমাণের স্বার্থে জমা ও সংরক্ষণ করা হয়েছে।

​থানায় অভিযোগ, চার চিহ্নিত আসামির নাম
​ঘটনার পরদিন মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) হোটেল কর্তৃপক্ষের পক্ষে মোঃ সেলিম (৪৬) বাদী হয়ে মতিঝিল থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।

অভিযোগে ফকিরাপুল পানির ট্যাংকির গলি এলাকার চারজনকে সুনির্দিষ্ট আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁরা হলেন—মোঃ মাসুম (৩৫), আক্তার (৩৬), সোহানুর রহমান সোহান (৩৪) এবং মাহিনুর রহমান মাহিন (২৬)। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ২৫ থেকে ৩০ জনকে আসামি করা হয়েছে। (উল্লেখ্য, এরা মামলার প্রাথমিক এজাহারভুক্ত অভিযুক্ত; আদালতে বিচারপ্রক্রিয়া শেষেই অপরাধ প্রমাণিত হবে।

ভরসা সিসিটিভি ফুটেজ, সিসি ক্যামেরায় অপরাধীদের চেহারাঃ বাণিজ্যিক এলাকায় এমন সশস্ত্র কায়দায় হামলার ঘটনায় তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। হোটেলের সিসিটিভি ক্যামেরায় পুরো ঘটনার অখণ্ড ভিডিও চিত্র সংরক্ষিত রয়েছে, যা ইতোমধ্যে তদন্তকারী কর্মকর্তাদের হাতে দেওয়া হয়েছে।

মতিঝিল থানা পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগটি হাতে পাওয়ার পর তদন্ত শুরু হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে জড়িত সন্ত্রাসীদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

​চরম আতঙ্কে থমথমে ফকিরাপুলঃ ​রাজধানীর অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র ফকিরাপুলে মাফিয়া স্টাইলে এই প্রকাশ্য তাণ্ডবের পর স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে তীব্র শঙ্কা বিরাজ করছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, “সন্ধ্যার ব্যস্ত সময়ে যদি একটি প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ঢুকে এভাবে কুপিয়ে ও পিটিয়ে লুটপাট চালানো হয়, তবে সাধারণ ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করবেন কীভাবে?” তাঁরা অনতিবিলম্বে ঘটনার মূল হোতাদের গ্রেপ্তার করে ফকিরাপুল এলাকায় নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন।