
বিশেষ প্রতিবেদক, খুলনাঃ এক সময় নিরিবিলি ও শান্তির শহর হিসেবে পরিচিত ছিল খুলনা। চরমপন্থীদের তৎপরতা ও এরশাদ শিকদারের অপরাধ জগতের মধ্য দিয়ে শহরটির অন্ধকার অধ্যায় শুরু হয়েছিল। মাঝখানে কিছুটা বিরতি থাকলেও এখন আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে অপরাধী গোষ্ঠীগুলো।
আবারে খুন, গুলি, চাঁদাবাজি, অপহরণ ও প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়ায় নগরজীবনে ফিরে এসেছে আতঙ্ক। এদের তৎপরতায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। সাম্প্রতিক সময়ে খুলনা মহানগরে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সংঘটিত অপরাধের বিভিন্ন ঘটনায় ঘুরে ফিরে কয়েকটি সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নাম উঠে এসেছে। এর মধ্যে শীর্ষ নয়টি সন্ত্রাসী গ্রুপের নাম আসছে বারবার। যেগুলো বিভিন্ন অপরাধে জড়িত। বাহিনী গঠন করে অপরাধ কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে তারা। একেকটি বাহিনীতে অন্তত ৩০ জনের বেশি সদস্য রয়েছে বলে জানা গেছে।
এদের বেশিরভাগ সদস্যের বয়স ১৬ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। মহানগরী ও আশপাশের এলাকায় খুনাখুনি, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা ও আধিপত্য বিস্তারে জড়িয়ে পড়া শীর্ষ ৯টি সন্ত্রাসী গ্রুপ ও তাদের প্রধানদের তথ্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বার বার উঠে এসেছে।
খুলনায় সক্রিয় ৯টি সন্ত্রাসী গ্রুপ কারাঃ সম্প্রতি প্রকাশ্যে গুলি ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা গুলোতে বি-কোম্পানির নাম আসছে বারবার।
বি-কোম্পানি হলো রনি চৌধুরী ওরফে ‘গ্রেনেড বাবুর’ নেতৃত্বাধীন একটি শীর্ষ অপরাধী চক্র। খুলনা সদর, লবণচরা ও হরিণটানা এলাকায় এই গ্রুপের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। মাদক ব্যবসা ও পূর্ব বিরোধের জের ধরে খুনাখুনিতে গ্রুপটি বেশি আলোচিত। এই গ্রুপের কয়েকজন সদস্যকে গ্রেফতার করা হলেও পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
পাশাপাশি রয়েছে পলাশ গ্রুপ। শেখ পলাশের নেতৃত্বে পরিচালিত হয় এই সন্ত্রাসী গ্রুপ। এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে এদের নাম রয়েছে।
এরপরে আছে হুমা বাহিনী। হুমায়ুন কবিরের নেতৃত্বে এই বাহিনীটি পরিচালিত হয়। দৌলতপুর ও খান জাহান আলী থানা এলাকায় এদের প্রভাব রয়েছে।
সম্প্রতি হত্যা ও গুলির ঘটনায় নাম আসছে আশিক বাহিনীর। আশিকের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গ্রুপটি মূলত খুলনা সদর ও লবণচরা থানা এলাকায় সক্রিয়। এ ছাড়া নূর আজিম গ্রুপ রয়েছে। নূর আজিমের নেতৃত্বে পরিচালিত গ্রুপটি খুলনা সদর ও লবণচরা এলাকায় অপরাধ কর্মকাণ্ড চালায়। পাশাপাশি টেনকি শাওন গ্রুপও আছে। শাওনের নেতৃত্বে এই গ্রুপটি সোনাডাঙ্গা ও খালিশপুর এলাকায় সক্রিয় রয়েছে। চাঁদাবাজি ও নানা অপরাধ কর্মকাণ্ডে তাদের নাম আসছে। আরও আছে আরমান গ্রুপ। আরমান শেখের নেতৃত্বাধীন এই গ্রুপ দৌলতপুর ও খান জাহান আলী এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে। শাকিল গ্রুপ। শাকিল শেখের নেতৃত্বে এই গ্রুপটি স্থানীয় অপরাধ ও সংঘাতে জড়িত। নাসিম গ্রুপ। নাসিমুল গানীর নেতৃত্বে এই গ্রুপটি পরিচালিত হতো। সম্প্রতি (২০২৬ সালের অক্টোবর মাসে) দিঘলিয়া উপজেলায় নাসিমুল ইসলামী নিহত হন। এ ছাড়া দীঘলিয়া, আরংঘাটা, ডুমুরিয়া, কয়রা, পাইকগাছা ও দাকোপসহ বিভিন্ন উপজেলায় স্থানীয়ভাবে ছোটখাটো সশস্ত্র গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে, যারা মাদক ও অস্ত্র ব্যবসা, নদীর ঘাট দখল, বালু ব্যবসা এবং চিংড়ির ঘের ও জমি দখলের দ্বন্দ্বে জড়িত।
আলোচিত বি-কোম্পানিঃ পুলিশের একাধিক সূত্রের দাবি, খুলনায় সক্রিয় অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে রনি চৌধুরী বাবু ওরফে গ্রেনেড বাবুর ‘বি কোম্পানি’ সবচেয়ে সক্রিয় ও শক্তিশালী। পাড়া-মহল্লা ভিত্তিক এজেন্টের মাধ্যমে গোষ্ঠীটি নিজেদের তৎপরতা চালায়। সমাজসেবা মূলক কাজের প্রচার থেকে শুরু করে অপরাধের নানা কর্মকাণ্ড—সব ক্ষেত্রেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করা হয়। ফেসবুক কেন্দ্রিক নিজস্ব প্রচারমাধ্যমও রয়েছে তাদের।
স্থানীয় লোকজন বলছেন, নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পুলিশের। অথচ খুলনায় এমন পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে, যখন রাতে একা চলাচল না করার জন্য পুলিশকে সতর্কবার্তা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
আধিপত্য বিস্তার নিয়ে কথায় কথায় দিনদুপুরে মানুষকে কুপিয়ে জখম করা হচ্ছে, ছোড়া হচ্ছে গুলি। প্রকাশ্যে তুলে নেওয়া হয়েছে সাব-রেজিস্ট্রারের মতো সরকারি কর্মকর্তাকে। খাদ্য বিভাগের এক কর্মকর্তাকে আঘাত করে তুলে নেওয়ার চেষ্টাও হয়েছে। মাদক চোরাচালান, কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য, মহল্লা ভিত্তিক নতুন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ও নীরব চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটছে। বিভিন্ন পেশার মানুষকে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করে হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। আবার কেউ কেউ নীরবে চাঁদা দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছেন। আবার অনেকে চাঁদাবাজদের ভয়ে বাড়িঘর ছেড়ে আত্মগোপনে রয়েছেন।
পাড়া-মহল্লায় রয়েছে এজেন্ট, চাঁদার দাবিতে হুমকিঃ পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ‘বি কোম্পানি’ এখন নবাবের নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন এলাকায় অপরাধ মূলক কর্মকাণ্ড চালানো হচ্ছে। প্রথমে রহস্যময় ব্যক্তি ছিল নবাব। কিন্তু ইতিমধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানতে পেরেছে জেল থেকে বের হওয়া গ্রেনেড বাবু-ই আসলে নবাব নামে এখন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। পাড়া-মহল্লায় থাকা এজেন্টদের মাধ্যমে বিভিন্ন নামে গ্রুপ তৈরি করা হয়েছে। এসব গ্রুপের সদস্যরা নিজেদের বি কোম্পানি বা নবাবের লোক পরিচয় দিয়ে চাঁদা দাবি করে। তারাই সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু বা টার্গেট নির্ধারণ করে। এরপর চাঁদা না দিলে গুলি করে আহত ও মেরে ফেলা হয়।
স্থানীয় একাধিক সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে, চাঁদা দিলে পরিস্থিতি এক রকম থাকে, আর না দিলে শুরু হয় অন্য ধরনের চাপ। নিয়মিত বিরতিতে মুঠোফোনে হুমকি ও ভয়ভীতি দেখানো হয়। সংশ্লিষ্ট এলাকায় মহড়া বাড়ানো, লোকবল বাড়িয়ে নজরদারি এবং কারও কারও চলাচল পর্যবেক্ষণ করা হয়। পরে মুঠোফোনে গতিবিধি নজরদারির বিষয়টি জানিয়ে ভয় দেখানো হয়। এমনকি নবাবের সঙ্গে কথা বলার জন্যও চাপ দেওয়া হয়। পুলিশকে জানালে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। অনেকে বাধ্য হয়ে গোপনে চাঁদা দিয়ে ঝামেলা মেটান।
এলাকা ভিত্তিক বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দুই বা তার বেশি তলা বিশিষ্ট বাড়ির মালিকদের বাছাই করে চাঁদা দাবি শুরু করেছে এই বাহিনী। নগরীর ৩০ ও ৩১ নম্বর ওয়ার্ড এলাকায় এ তৎপরতায় আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
এ ব্যাপারে পুলিশ সহ সকল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এগিয়ে আসার অনুরোধ জানিয়েছে নগরবাসী।



