মায়ের বুকফাটা আর্তনাদ , মেয়ে ছাড়া আমার কেউ নেই, ওকে দয়া করে খুঁজে দিন

মাঝনদীতে দাউ দাউ করে জ্বলছে লঞ্চ। প্রাণ বাঁচাতে সন্তান কোলে নদীর জলেই ঝাঁপ। প্রাণ বাঁচলেও কোলের থেকে ছিটকে গিয়েছে সন্তান। নিজের হারানিধির খোঁজে এখন পাগলপারা দুই মা। দেশের ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে ঢাকা থেকে বরগুনাগামী অভিযান-১০ লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এখনও কত জন নিখোঁজ তার কোনও হিসাব নেই। যারা নিখোঁজ আছেন তাদের সন্ধান পেতে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ এবং প্রশাসনের আধিকারিকরা। এইদিকে যারা নিখোঁজ তাদের মধ্যে আছে ঢাকার উত্তরা হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের পড়ুয়া স্বপ্নিলচন্দ্র হাওলাদার (১৬)। সেইসঙ্গেই কোনও খোঁজ নেই আড়াই বছরের তাবাচ্ছুম-র। তাদেরকে খুঁজে যাচ্ছেন ওই দুজনের মা। সন্তানদের খুঁজে না পেয়ে পাগলপ্রায় দুই মা-ই।

স্বপ্নিল তার মায়ের সঙ্গে গ্রামের বাড়ি বরগুনার বামনায় বেড়াতে যাচ্ছিল। তাবাচ্ছুমকে না পেয়ে মায়ের মতই পাগলপ্রায় অবস্থা তার বাবা বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার ছোট পাথরঘাটা গ্রামের একটি মসজিদের ইমাম মুহাম্মদ নাছরুলুল্লাহেরও। ওই দুজনের মা-বাবা তাঁদের সন্তানদের খোঁজে কখনও সুগন্ধা নদীর পাড়ে, আবার পরক্ষণেই সেখানের সদর হাসপাতালে ছুটছেন। একই অবস্থা নিখোঁজ থাকা অন্যদের আত্মীয়দের। তাঁদের বুকফাটা কান্নায় হাসপাতাল ও সুগন্ধার পাড়ের পরিবেশ ভারী হয়ে উঠছে। প্রশাসনের আধিকারিক জানিয়েছেন নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধারে জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে। কিন্তু কোনও কথাই শান্ত করতে পারছে না ওই দুই মাকে।

নাছরুলুল্লাহ বলেন, ‘লঞ্চের মধ্যে আগুন লাগার পরে ধোঁয়ায় টিকতে না পেরে আমি স্ত্রী–সন্তান নিয়ে তিনতলার ছাদে উঠে যাই। সেখানে কুয়াশার মধ্যে নদীর কিছু দেখা যাচ্ছিল না। এ অবস্থায়ই আমরা মেয়েসহ নদীতে ঝাঁপ দিই। তীরে ওঠার আগেই মেয়েকে হারিয়ে ফেলি।’ একমাত্র মেয়েকে তাঁর স্ত্রী সোনিয়া ভেঙে পড়েছেন। তিনি একটাই আবেদন, ‘ মেয়ে ছাড়া আমার কেউ নেই। আমার মেয়েকে খুঁজে এনে দিন।

স্বপ্নিলের মা স্বপ্না হাওলাদার বলেন, ‘লঞ্চে আগুন লাগার ঠিক আগের মুহূর্তে আমার ছেলে শৌচাগারে গিয়েছিল । আগুন ছড়িয়ে পড়লে আমি আমার ছোটছেলেকে নিয়ে কেবিন থেকে লঞ্চের সামনে যাই। পরে স্থানীয়রা আমাদের উদ্ধার করলেও আমার ছেলেকে খুঁজে পাইনি।’

বৃদ্ধ, শিশুসহ অনেকে নিখোঁজ। লঞ্চে আট শতাধিক যাত্রী ছিল। যারা নিখোঁজ তাদের সন্ধান পেতে হাসপাতালে এবং নদীর পাড়ে ভিড় বাড়ছে তাদের বাড়ির লোকের। সকলেরই একটাই প্রার্থনা, বেঁচে ফিরে আসুন তাদের বাড়ির লোকজন।

ঝালকাঠি সদর থানার ওসি খলিলুর রহমান এবং ঝালকাঠি ফায়ার সার্ভিস সিভিল ডিফেন্সের টিম লিডার সেলিম হোসেন বলেন, ‘ নিখোঁজ ব্যক্তিদের একটি তালিকা করা হচ্ছে। আমরা তাঁদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি।

রাত তিনটে নাগাদ ওই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৩৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ঝালকাঠি সদর হাসপাতালে শতাধিক যাত্রী দগ্ধ অবস্থায় চিকিৎসাধীন। বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মধ্যে চিকিৎসাধীন ১০ জনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাঁদের ঢাকার শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়েছে।

এইদিকে এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) জনসংযোগ আধিকারিক মিজানুর রহমান। পরিস্থিতি দেখতে ও সার্বিক অবস্থা জানতে নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী ঘটনাস্থলে যাচ্ছেন।