ই-পেপার Login
ছবি ভিডিও ভিডিও
বিশেষ প্রতিবেদন, সারা দেশ

বর্তমান চেয়ারম্যানের ছত্রছায়ায় কমিশন বাণিজ্য : বিআরটিসির ডিজিএম মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ : সুষ্ঠ তদন্তের দাবী

প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬ | ৩:০৫ অপরাহ্ণ




বিশেষ প্রতিবেদক, ঢাকাঃ বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশনের (বিআরটিসি) ডিজিএম (ভারপ্রাপ্ত-নির্মাণ) মো. মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, কমিশন বাণিজ্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারের ব্যাপক অভিযোগ উঠেছে। তার চাকরি জীবনের শুরু থেকেই বিভিন্ন পদে থাকাকালীন সময়ে কোটি কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।

সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান বরাবরে এ সব অভিযোগের তদন্ত চেয়ে আবেদন করেছেন রফিকুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি।

ওই অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, মো. মনিরুজ্জামান বিআরটিসিতে ১৯৯৯ সালে ইঞ্জিনিয়ার পদে যোগদান করেন। ২০০৩ সালে সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ার এবং পরে ম্যানেজার (কারিগরি) পদে জাতীয়করণ হন। ১৯৯৯ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত তিনি উল্লেখযোগ্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাননি। বেশির ভাগ সময় ডিপো বা ওয়ার্কশপে সহকারী পর্যায়ের দায়িত্ব পালন করেন।

তার জীবনের প্রথম বড় দায়িত্ব আসে কেন্দ্রীয় মেরামত কারখানা, তেজগাঁওয়ে। ২০০৯ সালের ১ জুলাই থেকে ২০১৩ সালের ১৪ মার্চ পর্যন্ত প্রায় ৪৫ মাস তিনি সেখানে ডিজিএম-এর দায়িত্ব পালন করেন। এ সময়ে তিনি ৭ কোটি ৭০ লাখ থেকে ৮ কোটি ৭০ লাখ টাকার দুর্নীতি করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কারখানায় মাসে ৭০-৮০ লাখ টাকা আয় হতো, যার প্রায় ৭০ শতাংশ যন্ত্রাংশ ক্রয়ে ব্যয় দেখানো হতো। মনিরুজ্জামান নিজস্ব লোক দিয়ে যন্ত্রাংশ কিনে গড়ে ৩০ শতাংশ কমিশন নিতেন। এতে মাসে প্রায় ১৫-১৭ লাখ টাকা হিসেবে ৪৫ মাসে ৬.৭৫ কোটি থেকে ৭.৬৫ কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে। ব্যবসা উন্নয়ন খাতে মাসে ৩.৫-৪ লাখ টাকার মধ্যে ৩ শতাংশ নিজে রেখে ২ শতাংশ অধীনস্থদের দিয়ে কাজ করাতেন। এতে অতিরিক্ত প্রায় ৯৪ লাখ থেকে ১ কোটি ৮ লাখ টাকার দুর্নীতি হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

এরপর তিনি নারায়ণগঞ্জ বাস ডিপোর দায়িত্ব পান (জুলাই ২০১৩ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০১৫)। ২০ মাসে ডিপোর নীট লাভ দেখানো হয় ১ কোটি ৮৬ লাখ টাকা কিন্তু তার ব্যক্তিগত অর্জন এর চেয়ে অনেক বেশি ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। কল্যাণপুর বাস ডিপোতে (মার্চ ২০১৫ থেকে অক্টোবর ২০১৬) ২০ মাসে নীট লস দেখানো হয় ৪ লাখ টাকা অথচ ব্যক্তিগত অর্জন ২-৩ কোটি টাকা বলে দাবি করা হয়। তৎকালীন চেয়ারম্যান মো. মিজানুর রহমান তাকে মডেল ম্যানেজার হিসেবে তুলে ধরেন। এরপর থেকে তিনি ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন।

২০২৩ সালে তিনি প্রধান কার্যালয়ের ডিজিএম (ওয়ার্কস) পদে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পান।
বিআরটিসির সাবেক চেয়ারম্যান মো. তাজুল ইসলামের অনুগ্রহে এই পদ পান বলে অভিযোগ রয়েছে। ডিজিএম ওয়ার্কস হিসেবে বিআরটিসির নিজস্ব অর্থায়নে ৪০ কোটি টাকার ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সরকারি অনুদানে ডিপিপি’র আওতায় ৫২ কোটি ৯ লাখ ২৫ হাজার টাকার প্রকল্পে তার ভাগে কমপক্ষে ৫ কোটি টাকা করে মোট ১০ কোটি টাকার উপরে আয় হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই টাকার অর্ধেক মারিং-কাটিং খাতে ব্যয় হয়েছে বলে দাবি করা হয়। অভ্যন্তরীণ অডিট করানো হয়নি। শুধু সরকারি অডিট কয়েকবার করানো হয়েছে যাতে প্রশ্ন না ওঠে।

কল্যাণপুর ডিপোতে তার সময়ে ক্যাশিয়ার মো. সাজ্জাদের ৩৫ লাখ টাকা আত্মসাতের ঘটনায় দুদকের মামলায় ক্যাশিয়ারের তিন বছরের জেল হলেও মনিরুজ্জামান থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। এছাড়াও জোয়ারসাহারা ডিপোতে তার প্রতিহিংসার শিকার হয়ে হিসাব ইনচার্জ মো. আ. কাদের আত্মহত্যা করতে বাধ্য হন বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও নির্মাণ বিভাগে তার অত্যাচারে একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী চাকরি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।

এ বিষয়ে বিআরটিসির বর্তমান চেয়ারম্যান মো. আব্দুল লতিফ মোল্লার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, যে কোনো অভিযোগ আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখি। যদি কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে যথাযথ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কর্পোরেশনের স্বার্থে স্বচ্ছতা বজায় রাখা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে চলমান এ ধরনের অভিযোগ উদ্বেগজনক। অভ্যন্তরীণ অডিট এড়ানো এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ যদি সত্য হয়, তাহলে তা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক শৃঙ্খলা ভেঙে দেয়। দ্রুত স্বাধীন তদন্ত ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিব ড. মো. শফিকুল আলম বলেন, বিআরটিসির মতো প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি মানে জনগণের অর্থের অপচয়। ডিপো ও ওয়ার্কশপ পর্যায়ে কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ পুরনো। শক্তিশালী অডিট ও নজরদারি ছাড়া এসব কখনো বন্ধ হবে না।

অভিযোগের বিষয়ে মো. মনিরুজ্জামানের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, যে সকল অভিযোগের কথা বলা হয়েছে তা দুদকে অভিযোগ করা হলে দুদকেই তা খতিয়ে দেখবে। এসকল অভিযোগের বিষয়ে তিনি কোনো বক্তব্য করতে রাজি হননি।

মো. মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে সকল বিষয় খতিয়ে দেখার জন্য সড়ক মন্ত্রী, সড়ক প্রতি মন্ত্রী, সড়ক সচিব সহ উর্ধতন কতৃপক্ষের আাশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছে বিআরটিসির সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারী সহ অভিজ্ঞ মহল।